আজ আমি এক অতিপ্রাকৃত গল্প বলতে যাচ্ছি। আমার এই গল্পটা পড়ার পর হয়তো এর ভৌতিক আবহ বিশ্বাস নাও হতে পারে, কিন্তু এটা পুরোপুরি আষাঢ়ে গল্প নয়। এটা এমন এক ঘটনা যা আমাকে বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝে এক সূক্ষ্ম সীমানার সামনে দাঁড় করিয়েছিল। আমাদের অফিসে বাইক রাখার গ্যারেজটা ছিল মূল বিল্ডিং থেকে অনেকটা দূরে। যেন এক কোণে নির্বাসিত। ভগ্নপ্রায় সেই ঘরটার কোনো জানালা নেই। দিনের আলো সেখানে প্রবেশ করে না বললেই চলে। অ্যাসবেস্টসের ছাদ যেন বছরের পর বছর ধরে চাপা পড়া অসংখ্য গোপন কথাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে রেখেছে। ভিতরে ঢুকলেই গুমোট অন্ধকার, বাতাসে এক অদ্ভুত স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, আর ছাদের উপর ঝুলে থাকা মাকড়সার জাল যেন কোনো অদৃশ্য রহস্যের ফাঁদ পেতেছে। গ্যারেজের দেওয়ালগুলো এতটাই জীর্ণ যে তাদের ফাটলে ফাটলে বটগাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, যা দেখে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই এই পরিত্যক্ত স্থানটিকে নিজের করে নিতে চাইছে।
এই গ্যারেজের পাহারাদার ছিলেন আমাদের প্রিয় রতন কাকা। প্রতিদিন বাইক রাখতে গিয়ে আমি একই দৃশ্য দেখতাম – একটি পুরোনো প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে কাকা খবরের কাগজ পড়ছেন, আর তার ঠোঁটে বিড়ি। আমাকে দেখলেই মুখের পরিচিত হাসিটা আরও চওড়া হতো, আর তিনি আন্তরিকভাবে ডাকতেন, “কী ভাইপো, কেমন আছো?” আমারও কেমন একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। বাইক রাখার পর তাড়াহুড়ো করে অফিসে না ঢুকে, পাঁচ-দশটা মিনিট কাকার সঙ্গে গল্প করতাম। তার সুখ-দুঃখের কথা, জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, আর হাসির গল্পে মেতে উঠতাম। অন্ধকার গ্যারেজটা তার উপস্থিতিতে কেমন যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠত।
কিন্তু একদিন সকালে অফিসে গিয়ে দেখি কাকা গ্যারেজে নেই, তালা মারা। মনটা একটু খুঁতখুঁত করছিল। ভাবলাম, হয়তো শরীর- টরীর খারাপ তাই কাকা আজ আর অফিসে আসেনি। কিন্তু অফিসে ঢোকার পর যে খবরটা শুনলাম, তা যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। শুনলাম “রতন কাকা গত রাতে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।” কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার মরদেহ আনা হলো অফিসে, শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। কাকার চিরশান্ত মুখটা দেখে বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। সেই হাসি, সেই বিড়ির গন্ধ, সেই আন্তরিকতা – সবকিছু যেন এক নিমেষে স্মৃতি হয়ে গেল।
এরপর থেকে প্রতিদিন অফিস শেষে বাইক আনতে গিয়ে আমার চোখ চলে যেত গ্যারেজের সেই নির্জন কোণটায়। যেখানে একটা পুরোনো চেয়ার একা পড়ে আছে। গ্যারেজে এমনিতেই আলো কম, তার ওপর সেই খালি চেয়ারটা দেখে মনটা আরও ভারি হয়ে যেত। কাকার স্মৃতি বারবার ভিড় করত মনে। কিন্তু বাস্তবকে তো মেনে নিতেই হয়। এইভাবেই দু-তিন মাস কেটে গেল।
একদিন অফিসের কাজের চাপে অনেক রাত হয়ে গেল। ঘড়িতে প্রায় দশটা বাজে। বাইক আনতে যখন গ্যারেজের দিকে এগোচ্ছি, হঠাৎ অদ্ভুত একটা শীতল হাওয়া গায়ে এসে লাগল। চারিদিকে এতটাই নিস্তব্ধতা, মনে হচ্ছিল যেন সময়ও থেমে গেছে আর গ্যারেজের অল্প আলোয় যেন সব কিছু রহস্যময় লাগছে।
যাই হোক, সাহসে ভর করে বাইক নিতে ঢুকলাম। হঠাৎ আমার চোখ পড়ল গ্যারেজের সেই কোণটায়। এক মুহূর্তের জন্য যেন আমার হৃৎপিণ্ডটা থেমে গেল। দেখি, সেই পুরোনো চেয়ারে অবিকল আগের মতোই কাকা বসে আছেন! ঠোঁটে বিড়ি, আর মুখে সেই পরিচিত হাসি। কিন্তু এবার তাঁর চোখদুটো অস্বাভাবিক লাল! তিনি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে খোনা গলায় বললেন, “কীঁ ভাঁইপো, কেঁমন আঁছো, হিঁ...হি. হিঁ..... হিঁ......” আমার সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ভয়ে আমার আত্মারাম খাঁচা! কোনোমতে বাইকটা ঠেলে নিয়ে আমি পাগলের মতো ছুটে পালালাম, পিছনে আর ফিরে তাকানোর সাহস হলো না!
পরদিন অফিসে সবাইকে ঘটনাটা বললাম। কিন্তু কেউ বিশ্বাসই করতে চাইল না। কত তক্ক-বিতক্ক হল। হ্যালুসিনেশনের যুক্তি উঠে এলো। শেষমেশ সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল, চেয়ারটা ওখান থেকে সরিয়ে ফেলবে। চেয়ার সরানো হলো। যাক নিশ্চিন্ত হলাম।
এর দুই সপ্তাহ পর, আবার এক রাতে কাজ শেষ করে বের হতে অনেক দেরি হয়ে গেল। সেই পুরোনো ভয়টা আবার ফিরে এলো। কিন্তু ভাবলাম, চেয়ার তো আর নেই, কাকা বসবেন কোথায়? এই ভেবে গ্যারেজে ঢুকতেই আমার চোখ ছানাবড়া! চেয়ার নেই তো কি, কাকা ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন, আর তার চোখ দুটো জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো আমার দিকে স্থির হয়ে আছে।
ভয় পেলেও এবার আর পালিয়ে গেলাম না। সাহস করে বললাম, “কী হয়েছে কাকা? অমন করে তাকিয়ে আছ কেন?”
তিনি অদ্ভুত এক ক্ষোভ নিয়ে বললেন, “ভাইপো, আমি কি তোমার কোনো ক্ষতি করেছি?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “নাহ্! কিন্তু কেন?”
তিনি বললেন, - আমার চেয়ার কোথায়.....?
ভয়ে আমি চুপ করে রইলাম।
এবার তিনি আক্ষেপের গলায় বললেন - “তুমি জানো না ভাইপো! আগে দিনের আলো আর রাতের অন্ধকার—দুটো ছিল আলাদা জগত। দিন মানেই মানুষের কোলাহল, আর রাত মানেই বিদেহী আত্মাদের নিঃশব্দের রাজত্ব। কিন্তু এখন? আধুনিক যুগে আলো-অন্ধকারের কোনো সীমারেখাই নেই। দিনের আলো, রাতের আলো—সব একাকার। বিদেহী আত্মারা কোথায় যাবে বলো? মানুষের ভিড়ের ফাঁকে তারা ছায়ার মতো আটকে আছে, মুক্তির আশায় হাহাকার করছে।
এমন এক দুঃসময়ে, আমি তাদের কান্না শুনতাম। তারা মুক্তির পথ খুঁজত—কেউ অশান্ত আত্মা, কেউ হারানো ভালোবাসার তৃষ্ণায়, কেউ আবার ভেঙে পড়া স্মৃতির অচলাবস্থায় বন্দী। ডিজিটাল যুগের এই অদম্য ছুটে চলার ভিড়ে মানুষ যতই ব্যস্ত হচ্ছে, তার অন্তরের শূন্যতা ততই গভীর হচ্ছে। আলো-অন্ধকারের সীমারেখা মুছে গেছে, রাতও আর রাত নেই—সবখানেই কেবল কৃত্রিম আলো। আর সেই অবিরাম আলোর ফাঁদে বিদেহী আত্মারা যেন দম আটকে মরছে। তারা মুক্তির রাস্তা খুঁজে পায় না, যেন এই আধুনিক যুগ নিজেই তাদের জন্য নতুন এক কারাগার।”
“আমি সারাদিন বন-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে রাতে এই পুরোনো চেয়ারটায় বসে একটু শান্তি খুঁজতাম। মনের সুখে বিড়িতে একটু সুখটান দিতাম, আর চারপাশে তাকিয়ে ভাবতাম—এই আধুনিক নগরায়ন আর ডিজিটাল দুনিয়ার ভিড়ে বিদেহী আত্মাদের কী দুরবস্থা! কিন্তু সেটাও তোমাদের সহ্য হলো না?”
আমি তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতিটা সামলে নিলাম। বললাম, “কাকা, চিন্তা কোরো না। কে বা কারা চেয়ারটা সরিয়েছে, আমি খোঁজ নিচ্ছি।” আমার জন্যেই যে চেয়ারটা সরানো হয়েছে, সেই কথাটা বেমালুম চেপে গেলাম।
পরদিন অফিসে কাউকে কিচ্ছু বললাম না। একা একাই চেয়ারটা খুঁজে বের করলাম। সেটিকে আবার গ্যারেজের কোণায় যথাস্থানে রেখে দিলাম। আমার মনে হলো, যদি কাকার বিদেহী আত্মা এই চেয়ারে বসে বিড়িতে সুখটান মেরে শান্তি পায়, তো পাক না! কী আসে যায়?