আমাদের পাড়ায় রেজাব এক অদ্ভুত মানুষ। ছোটবেলা থেকে মাঝবয়স—পাখির প্রতি তার অকৃত্রিম আগ্রহ এতটুকুও কমেনি। গ্রামের মোড়ে যখন সবাই সাংসারিক বা রাজনৈতিক গল্পগুজবে মশগুল থাকে, রেজাব তখন একেবারে চুপচাপ। কিন্তু যেই পাখির প্রসঙ্গ ওঠে, তখন আর তাকে পায় কে! কোন গাছে শালিক পাখি বাচ্চা তুলেছে, কোন গাছের কোটরে কাঠঠোকরার বাসা, পুকুরধারের ডুমুর গাছে টুনটুনির বাসা—ইত্যাদি কত যে গল্প তার কাছে!
ছেলেবেলায় দেখতাম, রেজাব বিভিন্ন পাখির ছানা ধরে এনে সযত্নে পুষত। এমনকি শালিকের বুলি বলাতেও সে ছিল ওস্তাদ। আমাদের গ্রামের ধারেই ছিল এক বিশাল আমন ধানের খেত, যা বছরের বাকি সময়টায় নরম ঘাসে ভরে থাকত। সেখানেই লুকিয়ে থাকত ঘাসফড়িংয়ের দল। রেজাব একটা খেজুর গাছের ডাল চেঁছে, আগার দিকে কিছু পাতা রেখে শিকারের এক অভিনব অস্ত্র তৈরি করত—গ্রাম্য ভাষায় যাকে বলে 'ছাঁট লাঠি'। এই লাঠি নিয়ে সে মাঠে যেত। ঘাসের ওপর ছাঁট ঘোরাতেই যেই কোনো ফড়িং লাফিয়ে উঠত, একটি সুনিপুণ আঘাতে সেটিকে সে আধমরা করে ফেলত। তারপর সেই ফড়িংগুলোকে কাঁচের তৈরি ওষুধের ফাঁকা শিশিতে পুরে রাখত। শিশির ছিপিতে আবার ছোট ছোট ছিদ্র করা থাকত, যাতে আধমরা ফড়িংটা একেবারে মরে না যায়। সে বলত, "মরা ফড়িং পাখিকে খাওয়াতে নেই।" সংসার চালানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম সে করত ঠিকই, গায়ে জোরও ছিল প্রচুর; কিন্তু কাজের ফাঁকে এই পাখির নেশা তাকে অবিরাম তাড়া করে বেড়াত।
এই
তো সেদিন অফিসে যাওয়ার পথে রেজাবের সাথে দেখা। দেখি, তার হাতে নাম-না-জানা দুটো পাখির
ছানা—এখনও ভালো করে উড়তে শেখেনি। জিজ্ঞাসা করলাম, "রেজাব, এ আবার কোথা থেকে জুটল?"
সে জানাল, বাপিদের জলকরের আলা’র পাশে বাসা ছিল, সেখান থেকে ধরেছে। এও জানাল যে, এরা
ঘাসের দানা খায়। জিজ্ঞেস করলাম, "এখন কী করবি এদের নিয়ে?" একটু ম্লান মুখে
সে জানাল, মাছ ধরতে গিয়ে ছানা দুটো ধরেছিল পুষবে বলে। কিন্তু বাড়ি নিয়ে যেতেই তার স্ত্রী
আর ছেলেমেয়েরা খুব বকাবকি করেছে। সন্তানরা এখন বড় হয়েছে, এই বয়সে পিতার এমন 'শিশুসুলভ'
পাখি-নেশা তাদের ঘোর অপছন্দ। তাই এখন সে ছানা দুটোকে তাদের মায়ের বাসায় ফিরিয়ে দিতে
যাচ্ছে। রেজাব হয়তো নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসার কাছে আজ কিছুটা পরাজিত।
রেজাবের
এই পক্ষী-বিলাসের আরও একটি রোমাঞ্চকর গল্প বলি। আমাদের বাড়ির পাশে এক বিশাল তালগাছের
কোটরে বনটিয়া বাচ্চা তুলেছিল। সে পাখি ধরার অদম্য টানে বুক ঘষে ঘষে সেই দুর্গম গাছে
উঠল। কোটর থেকে পাখির ছানা ধরতে গিয়ে ভুল করে ধরে ফেলল মা-পাখিকে। প্রাণ বাঁচাতে টিয়াটি
রেজাবের হাতে সজোরে কামড় বসাল। রক্ত ঝরতে লাগল, তবু সে পাখি নিয়েই নিচে নামল। তার কাছে
যেন এই পাখি-লাভ সব শারীরিক কষ্টের ঊর্ধ্বে।
রেজাবকে
দেখে আমারও একবার পাখি পোষার শখ হয়েছিল। তাকে জানাতেই সে আশ্বস্ত করে বলল, দু-দিনের
মধ্যে সে আমাকে পাখির ছানা এনে দেবে। কথা রেখেছিল সে। দু-দিন পরেই দুটি বুলবুলি পাখির
ছানা নিয়ে আমাদের বাড়িতে হাজির। ছানাগুলো খুব ছোট। আমি একটা মাটির ভাঁড় জোগাড় করে তার
নিচে খড় বিছিয়ে পাখি দুটোকে রাখলাম।
তখন
জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ দিক। আমাদের বাড়ির উঠোন-লাগোয়া জামগাছতলা থেকে পাকা জাম কুড়িয়ে শাঁস
বের করে ছানা দুটোকে খাওয়াতে লাগলাম। পরদিন সকালে রেজাব এল খবর নিতে। এ ব্যাপারে তার
সজাগ দৃষ্টি।
"কী
খাবাচ্ছি?"—প্রশ্ন করল সে। বললাম, "জাম শাঁস।" সে পক্ষী-বিশেষজ্ঞের
মতো গম্ভীর ভাব করে বলল, "এতে কি ওগা প্যাট ভরে?"
এই
বলে সে দৌড়ে বাড়ি গেল এবং সেই ফড়িং-ভরা কাঁচের শিশিটা নিয়ে এল। শিশি থেকে দুটো বড় ঘাসফড়িং
বের করে পাখির ছানা দুটোর ঠোঁট ফাঁক করে অতি কষ্টে তাদের একটি করে আস্ত ফড়িং খাইয়ে
দিল। তারপর তৃপ্তির হাসি হেসে বলল, "এইবার প্যাট পুরিছে ওগা! আজ আর কিছু খাবাবি
না। এই বোতলটা রেখে দে, এতে আরু দুটো ফড়িং আছে, কাল সোকালে এভাবে খাবাবি।"
আমি
ভাঁড়টি তক্তাপোশের নিচে রেখে খেলতে গেলাম। রাতেও ছানাদের কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না। ভাবলাম
পেট ভরে খেয়েছে, তাই নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। আমিও রাতে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন
সকালে উঠে পাখিদের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি, মাটির ভাঁড়ের মধ্যে পাখি দুটো সেই একইভাবে
ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু রেজাবের কথা—তাদের তো এখন খাওয়াতে হবে। তাই আমি ছানা দুটিকে জাগানোর
চেষ্টা করলাম। কিন্তু কী আশ্চর্য, তারা কোনো সাড়াই দিচ্ছে না! ভালো করে দেখে বুঝলাম,
গতকালের সেই ধাড়ি ঘাসফড়িং খাওয়ার পর তারা এ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছে।
তাড়াতাড়ি
রেজাবকে ডাকতে গেলাম। সব শুনে সে বলল, "তুই যা, আমি আসতিছি।"
আমি
বাড়ি ফিরে অপেক্ষায় রইলাম, কিন্তু দু-ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও রেজাবের কোনো পাত্তা নেই।
অগত্যা মাকে সব জানালাম। মা বকা দিয়ে মৃত ছানা দুটোকে বাগানে ফেলে দিতে বললেন। কিন্তু
এই দু-দিনে ছানা দুটোর ওপর আমার গভীর মায়া পড়ে গিয়েছিল। নিড়ানি দিয়ে বাগানে মাটি খুঁড়ে
ছোট্ট একটি গর্ত করলাম, তারপর পরম মমতায় সেই গর্তে মৃত ছানা দুটোকে শুইয়ে মাটি চাপা
দিলাম। মনটা খুব ভারাক্রান্ত হয়ে গেল।
এরপর
প্রায় দুই সপ্তাহ রেজাবকে আমার সামনে আসতে দেখিনি। হয়তো সেও বুঝেছিল, তার অতিরিক্ত
পাখিপ্রেম আর ভুল উপদেশেই আমার প্রথম এবং শেষ পাখি পোষার শখটা এভাবেই বিষাদে শেষ হয়েছিল।
রেজাবের
এই স্বভাব তোমাদের চোখে কেমন ধরা দেয়? তার এই পক্ষী-বিলাস কি শুধুই নেশা, নাকি এক ধরনের
সহজ-সরল ভালোবাসা?