এই গ্যারেজের পাহারাদার ছিলেন আমাদের প্রিয় রতন কাকা। প্রতিদিন বাইক রাখতে গিয়ে আমি একই দৃশ্য দেখতাম – একটি পুরোনো প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে কাকা খবরের কাগজ পড়ছেন, আর তার ঠোঁটে বিড়ি। আমাকে দেখলেই মুখের পরিচিত হাসিটা আরও চওড়া হতো, আর তিনি আন্তরিকভাবে ডাকতেন, “কী ভাইপো, কেমন আছো?” আমারও কেমন একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। বাইক রাখার পর তাড়াহুড়ো করে অফিসে না ঢুকে, পাঁচ-দশটা মিনিট কাকার সঙ্গে গল্প করতাম। তার সুখ-দুঃখের কথা, জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, আর হাসির গল্পে মেতে উঠতাম। অন্ধকার গ্যারেজটা তার উপস্থিতিতে কেমন যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠত।
এরপর থেকে প্রতিদিন অফিস শেষে বাইক আনতে গিয়ে আমার চোখ চলে যেত গ্যারেজের সেই নির্জন কোণটায়। যেখানে একটা পুরোনো চেয়ার একা পড়ে আছে। গ্যারেজে এমনিতেই আলো কম, তার ওপর সেই খালি চেয়ারটা দেখে মনটা আরও ভারি হয়ে যেত। কাকার স্মৃতি বারবার ভিড় করত মনে। কিন্তু বাস্তবকে তো মেনে নিতেই হয়। এইভাবেই দু-তিন মাস কেটে গেল।
যাই হোক, সাহসে ভর করে বাইক নিতে ঢুকলাম। হঠাৎ আমার চোখ পড়ল গ্যারেজের সেই কোণটায়। এক মুহূর্তের জন্য যেন আমার হৃৎপিণ্ডটা থেমে গেল। দেখি, সেই পুরোনো চেয়ারে অবিকল আগের মতোই কাকা বসে আছেন! ঠোঁটে বিড়ি, আর মুখে সেই পরিচিত হাসি। কিন্তু এবার তাঁর চোখদুটো অস্বাভাবিক লাল! তিনি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে খোনা গলায় বললেন, “কীঁ ভাঁইপো, কেঁমন আঁছো, হিঁ...হি. হিঁ..... হিঁ......” আমার সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ভয়ে আমার আত্মারাম খাঁচা! কোনোমতে বাইকটা ঠেলে নিয়ে আমি পাগলের মতো ছুটে পালালাম, পিছনে আর ফিরে তাকানোর সাহস হলো না! পরদিন অফিসে সবাইকে ঘটনাটা বললাম। কিন্তু কেউ বিশ্বাসই করতে চাইল না। কত তক্ক-বিতক্ক হল। হ্যালুসিনেশনের যুক্তি উঠে এলো। শেষমেশ সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল, চেয়ারটা ওখান থেকে সরিয়ে ফেলবে। চেয়ার সরানো হলো। যাক নিশ্চিন্ত হলাম।
ভয় পেলেও এবার আর পালিয়ে গেলাম না। সাহস করে বললাম, “কী হয়েছে কাকা? অমন করে তাকিয়ে আছ কেন?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “নাহ্! কিন্তু কেন?”
তিনি বললেন, - আমার চেয়ার কোথায়.....?
ভয়ে আমি চুপ করে রইলাম।
এবার তিনি আক্ষেপের গলায় বললেন - “তুমি জানো না ভাইপো! আগে দিনের আলো আর রাতের অন্ধকার—দুটো ছিল আলাদা জগত। দিন মানেই মানুষের কোলাহল, আর রাত মানেই বিদেহী আত্মাদের নিঃশব্দের রাজত্ব। কিন্তু এখন? আধুনিক যুগে আলো-অন্ধকারের কোনো সীমারেখাই নেই। দিনের আলো, রাতের আলো—সব একাকার। বিদেহী আত্মারা কোথায় যাবে বলো? মানুষের ভিড়ের ফাঁকে তারা ছায়ার মতো আটকে আছে, মুক্তির আশায় হাহাকার করছে।
“আমি সারাদিন বন-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে রাতে এই পুরোনো চেয়ারটায় বসে একটু শান্তি খুঁজতাম। মনের সুখে বিড়িতে একটু সুখটান দিতাম, আর চারপাশে তাকিয়ে ভাবতাম—এই আধুনিক নগরায়ন আর ডিজিটাল দুনিয়ার ভিড়ে বিদেহী আত্মাদের কী দুরবস্থা! কিন্তু সেটাও তোমাদের সহ্য হলো না?”
পরদিন অফিসে কাউকে কিচ্ছু বললাম না। একা একাই চেয়ারটা খুঁজে বের করলাম। সেটিকে আবার গ্যারেজের কোণায় যথাস্থানে রেখে দিলাম। আমার মনে হলো, যদি কাকার বিদেহী আত্মা এই চেয়ারে বসে বিড়িতে সুখটান মেরে শান্তি পায়, তো পাক না! কী আসে যায়?