আচ্ছা, কখনো কি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন—কে আমি? এই পৃথিবীতে আসার আগে কোথায় ছিলাম? কোন অদৃশ্য জগতের নিঃশব্দ কোণ থেকে এসে আমি এই সজীব দেহে আশ্রয় নিলাম? যদি আমার জন্মই না হতো, তবে কি এই "আমি" আদৌ কোথাও ছিলাম? এই প্রশ্নগুলো আমাদের অস্তিত্বের গভীরতম রহস্যের দিকে নিয়ে যায়।
আমরা যখন শৈশবের কোল থেকে ধীরে ধীরে জগৎ চিনতে শিখি, কথা বলতে ও বুঝতে শিখি, তখনই "আমি আছি"—এই অনুভূতি জন্ম নেয়। মস্তিষ্ক যখন পরিপক্ক হয়, তখনই আমরা নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হই। কিন্তু ভাবুন তো, সেই নবজাত শিশুটির কথা, যে জন্মের অল্প পরেই নিঃশ্বাস হারায়—সে তো নিজের অস্তিত্ব উপলব্ধি করার আগেই হারিয়ে যায়, এমনকি এই জগতে কোনো স্বাক্ষরও রেখে যেতে পারে না। তাহলে কি সে অস্তিত্বহীন? না কি সে অন্য কোনো অদৃশ্য স্তরে আজও বেঁচে আছে, যেখানে জন্ম-মৃত্যুর কোনো মানে নেই?
একটু সরলভাবেই ভাবা যাক। ধরুন আমি জন্ম গ্রহণ করে বড় হয়েছি, বুঝতে শিখেছি, আমার অস্তিত্ব সম্পর্কে অনুধাবন করতে শিখেছি, আমার একটা 'আমিত্ব' আছে। এখন প্রশ্ন হল, আমি জন্মাবার আগে কি আমার কোনো অস্তিত্ব ছিল এই সৃষ্টি জগতে? সৃষ্টি জগৎ বলতে আমরা সমগ্র বিশ্বকে বুঝি—সব কিছু, গ্রহ-নক্ষত্র, অন্তহীন আকাশ, মহাকাশ। এই নক্ষত্রখচিত মহাবিশ্বের বিশালতায় কি আমি সম্পূর্ণই অনুপস্থিত ছিলাম? হয়তো না। হয়তো আমি ছিলাম অন্য কোনো রূপে, অন্য কোনো চেতনায়, যা এখন মুছে গেছে সময়ের পর্দায়।
কিন্তু যদি সত্যিই থেকে থাকি, তবে সেই অস্তিত্বের কথা এখন মনে করতে পারি না কেন? এটা হতেই পারে যে আমি আগে অন্য এক জগতে ছিলাম, তখন সেই জগতে আমার অস্তিত্বকে আমি উপলব্ধি করতে পারতাম। কিন্তু যখনই সেই জগৎ থেকে এই জগতে এলাম, পূর্বের সব অস্তিত্বের স্মৃতি যেন মুছে গেছে বা আর মনে নেই। হতে পারে আমাদের মস্তিষ্ককে 'ফরম্যাট' করে নতুনভাবে নিজের অস্তিত্বের স্মৃতি লেখার জন্য তৈরি করা হয়েছে!
আবার দেখুন, কোনো মানুষ যদি কিছুক্ষণের জন্য অজ্ঞান হয়ে যায়, পরে জ্ঞান ফিরলে কিন্তু সে সেই অজ্ঞান অবস্থার কোনো স্মৃতি মনে করতে পারে না। তখন তার আমিত্ব কোথায় যায়? ঠিক একইভাবে, আমরা যখন অঘোরে ঘুমাই, তখন সেই 'আমি' বা আমার চেতনা কোথায় থাকে? যেমন মানুষ অজ্ঞান হলে তার চেতনা সাময়িকভাবে লোপ পায়, কিন্তু সে নিজে হারিয়ে যায় না; জ্ঞান ফিরলে সে ফিরে আসে, ঠিক তেমনি হয়তো জন্ম আর মৃত্যু—দুই প্রান্তের মাঝখানে চেতনার ওঠানামা। ঘুমের মতোই এক গভীর নিদ্রা, যেখানে "আমি" হারিয়ে যায়, আবার নতুন কোনো প্রভাতে জেগে ওঠে।
আমার এক পরিচিত অসুস্থ মানুষ দীর্ঘদিন সংজ্ঞাহীন ছিলেন এবং জ্ঞান ফেরার পর বেশ কিছুদিন পূর্বের কোনো কিছুই মনে করতে পারছিলেন না। হয়তো তাঁর মস্তিষ্ক পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসতে সময় নিচ্ছিল। দীর্ঘ সংজ্ঞাহীনতার পর যখন কেউ ধীরে ধীরে স্মৃতি ফিরে পায়, তখন মনে হয়—চেতনা হয়তো কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না, কেবল আড়ালে চলে যায়, যেমন সূর্য ডোবে, কিন্তু আলো হারায় না।
আবার অনেকের ক্ষেত্রে শোনা যায় স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে, কিংবা বয়স্ক মানুষ বার্ধক্যজনিত কারণে পূর্বের কথা ভুলে যান। এই সব ক্ষেত্রেই মস্তিষ্কের সক্রিয়তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
এই ঘটনাগুলো আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে: আমাদের মস্তিষ্কই কি আমার অস্তিত্বের একমাত্র আধার? তাহলে, আমাদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তায়ই কি আমাদের অস্তিত্ব? নাকি মস্তিষ্ক কেবল সেই জানালা, যার ওপারে আত্মা চুপচাপ বসে জগৎকে দেখে?
মানুষের মস্তিষ্ক এক আশ্চর্য পাণ্ডুলিপি—জন্মের পর একেবারে খালি পাতা। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, স্মৃতি—সব সেখানে লেখা হয়। আমরা মানুষ জন্মের পরে কান্না আর হাত-পা নাড়ানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না। কিন্তু বাকি প্রাণিকুল জন্মাবার সাথে সাথেই কিছু না কিছু কাজ সহজেই করতে পারে। অন্য প্রাণীরা জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই কিছু প্রবৃত্তি নিয়ে আসে, যেন তাদের মধ্যে কিছু পূর্বলিখিত কোড আগে থেকেই ইনস্টল করা। এক্ষেত্রে, হতে পারে তাদের মস্তিষ্কে কিছু সহজাত জিনিস জন্মগতভাবে 'ইনস্টল' করা থাকে।
তবে মানুষ? মানবসন্তানের ক্ষেত্রে হয়তো ক্ষুধা বা আঘাত লাগলে কান্না—এইটুকুই কেবল খালি মেমোরিতে ইনস্টল করা থাকে, বাকিটা অর্জন করে নিতে হয়। মানুষ যেন সৃষ্টি-স্রষ্টার হাতে লেখা এক অসমাপ্ত কবিতা—যাকে প্রতিটি জন্মে নতুন করে রচনা করতে হয়।
এখন প্রশ্ন হলো: আমরা যদি মারা যাই, তাহলে আমার অস্তিত্ব বা আমিত্ব কোথায় যাবে? আমি কি বুঝতে পারব বা জীবিত অবস্থায় যা যা করেছি, আমার কি মনে থাকবে? মৃত্যুর পর কী হয়? আমি কোথায় যাই? এই "আমি" কি মুছে যায়, নাকি অন্য কোথাও, অন্য দেহে, অন্য চেতনায় পুনর্জন্ম লাভ করে?
যদি মৃত্যুর পর স্মৃতি থাকে, তাহলে জন্মের আগের জগতের স্মৃতি আমরা কেন মনে করতে পারি না? তাহলে কি আমরা মারা যাওয়ার পর যে জগতে যাব, সেখানেও কি আমাদের মস্তিষ্ক কিছু সহজাত জিনিস ছাড়া সবকিছু মুছে দেবে? হয়তো মৃত্যুর পরও চেতনা কোনো রূপে টিকে থাকে—যেমন সুর বিলীন হয় না, কেবল তরঙ্গপথ বদলে ফেলে। হয়তো সেই নতুন জীবনে আমরা কিছু সহজাত স্মৃতি নিয়ে যাই—যেমন নবজাত শিশুর ক্ষুধা বা কান্না। বাকি সব মুছে যায়, নতুন গল্প লেখার জন্য।
বা এমনও তো হতে পারে যে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি আমাদের মস্তিষ্ক একেবারে 'ফরম্যাট' না করে কিছু কিছু রেখে দিতে পারেন, ঠিক যেমনটি আমরা জন্মসূত্রে সহজাতভাবে পাই। অথবা হয়তো উল্লেখিত সংজ্ঞাহীন মানুষটির মতো প্রথমে কিছু মনে না করতে পারলেও পরে তা ধীরে ধীরে মনে পড়তে পারে।
আমার অতীত কী ছিল, আমি কোন জগৎ থেকে এসেছি, আর কী ছিল আমার পরিচয়—এই প্রশ্নগুলো ভাবলে কেমন যেন অদ্ভুত লাগে। সত্যিই এটা এক রহস্য। এই পৃথিবীতে না এলে কি আমার কোনো অস্তিত্ব থাকত না? আবার আমি মারা যাওয়ার পর আমার অস্তিত্ব কোন জগতে যাবে, নাকি মস্তিষ্ক ফরম্যাটিং হয়ে পুনরায় এই জগতেই জন্ম লাভ করব?
তাহলে কি পুনর্জন্ম সত্য? এক্ষেত্রে হয়তো মস্তিষ্ক থেকে পূর্বের সব কিছু মুছে দেওয়ায় আমি পূর্বের অস্তিত্বের কথা মনে করতে পারি না। কিন্তু সেটা কিভাবে বুঝব, যদি আমার মস্তিষ্ক থেকে সবকিছু মুছে দেওয়া হয়? নাকি এটা কেবল মস্তিষ্কের নতুন এক প্রোগ্রাম, যেখানে পুরোনো ডেটা ফরম্যাট হয়ে যায়, কিন্তু কোডের কোনো ছায়া থেকে যায় গভীরে—অচেতন স্মৃতির স্তরে? যেমন এক সংজ্ঞাহীন মানুষ ধীরে ধীরে স্মৃতি ফিরে পায়, হয়তো তেমনি আত্মাও একদিন পুরোনো জীবনের আভাস ফিরে পাবে। সত্যিই বিস্ময়কর, তাই না?
আমরা কে, কোথা থেকে এসেছি, আবার কোথায় যাব—এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো দার্শনিক বইতে নেই, নেই কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণেও। হয়তো উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের নিজস্ব "আমি"-এর গভীরে—যে আমি কেবল দেহ নয়, কেবল মস্তিষ্ক নয়, বরং এক চিরন্তন যাত্রী—অস্তিত্বের অনন্ত পথে, উৎস আর গন্তব্যের সন্ধানে।
হয়তো এই অন্বেষণই জীবনের প্রকৃত অর্থ—নিজেকে খুঁজে পাওয়া, নিজেকে চিনে ফেলা, আর এই অদ্ভুত "আমি"-এর রহস্যে ডুবে যাওয়া।