আমাদের পাড়ায় রেজাব ছিল এক অদ্ভুত মানুষ।
অদ্ভুত বলছি এই কারণে নয় যে সে খুব রাগী, গম্ভীর কিংবা খেয়ালি ছিল। বরং সংসারের আর পাঁচজন মানুষের মতোই সে ছিল—পরিশ্রমী, শক্তসমর্থ, নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু তার একটা আলাদা জগৎ ছিল। সেই জগতে মানুষের চেয়ে পাখিরাই ছিল বেশি আপন।
ছোটবেলা থেকে মাঝবয়স পর্যন্ত সময়ের কত নদী যে তার জীবন ছুঁয়ে চলে গেছে, তার হিসাব নেই। বদলেছে মানুষ, বদলেছে গ্রামের চেহারা, বদলেছে আমাদের ব্যস্ততা। শুধু রেজাবের পাখিপ্রেমটুকু যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
গ্রামের মোড়ে বিকেলের দিকে যখন সবাই সংসার, জমিজমা, চাষবাস কিংবা রাজনীতির গল্পে মশগুল হয়ে উঠত, রেজাব তখন চুপচাপ বসে থাকত। তাকে দেখে মনে হতো, কথাবার্তায় তার তেমন আগ্রহ নেই।
কিন্তু ভুলেও যদি কেউ পাখির প্রসঙ্গ তুলত, তাহলেই রেজাব যেন অন্য মানুষ হয়ে যেত।
কোন গাছে শালিক বাসা বেঁধেছে, কোন গাছের খোড়লে কাঠঠোকরা বাচ্চা তুলেছে, পুকুরপাড়ের ডুমুরগাছে টুনটুনির বাসা হয়েছে—সব তার নখদর্পণে।
ছোটবেলায় দেখেছি, বিভিন্ন পাখির ছানা ধরে এনে সে পরম যত্নে পুষত। শালিককে মানুষের বুলি শেখাতেও তার জুড়ি মেলা ভার।
আমাদের গ্রামের ধারেই ছিল এক বিশাল আমন ধানক্ষেত। বর্ষায় সেখানে ধান দুলত, আর ধান কেটে নেওয়ার পর সেই জমিই আবার ভরে উঠত নরম সবুজ ঘাসে। সেই ঘাসের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকত অসংখ্য ঘাসফড়িং।
রেজাবের চোখে সেগুলো ছিল নিছক ঘাসফড়িং নয়—ওগুলো ছিল তার পাখিদের খাবার।
একটা খেজুর গাছের সরু ডাল চেঁছে, আগার দিকে কয়েকটি পাতা রেখে সে বানিয়ে নিত এক অদ্ভুত শিকারের অস্ত্র। গ্রামের ভাষায় যার নাম ছিল ‘ছাট লাঠি’।
সেই লাঠি হাতে নিয়ে সে মাঠে নামত।
ঘাসের ওপর ছাট ঘুরত, আর যেই কোনো ফড়িং লাফিয়ে উঠত, অমনি সুনিপুণ এক আঘাত।
ফড়িংটা আধমরা হয়ে পড়ে থাকত।
রেজাব তাকে কুড়িয়ে নিয়ে পুরে রাখত কাঁচের বোতলে। বোতলের ছিপিতে ছোট ছোট ছিদ্র করে রাখত, যাতে ভেতরে একটু বাতাস ঢোকে এবং ফড়িংগুলো একেবারে মরে না যায়।
তার যুক্তিটাও ছিল বেশ বিচিত্র—
“মরা ফড়িং পাখিকে খাওয়াতে নেই।”
সংসার চালানোর জন্য রেজাবকে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হতো। কাজের মানুষ ছিল সে। গায়েও ছিল প্রচুর জোর। কিন্তু যত কাজই থাকুক, পাখির নেশাটা তাকে ছাড়ত না।
মনে হতো, পাখিরা যেন তাকে দূর থেকে ডাকত।
আর রেজাব সেই ডাক এড়াতে পারত না।
এই তো সেদিনের কথা।
অফিসে যাওয়ার পথে রেজাবের সঙ্গে দেখা। দেখি, তার হাতে দুটো ছোট্ট পাখির ছানা। এমন ছোট যে, ঠিকমতো উড়তেও শেখেনি।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— “রেজাব, এ আবার কোথা থেকে পেলি?”
রেজাব জানাল, বাপিদের জলকরের আলার পাশে একটা বাসা ছিল। সেখান থেকেই ছানা দুটো ধরেছে। আরও জানাল, এরা ঘাসের দানা খায়।
আমি আবার প্রশ্ন করলাম,
— “এখন কী করবি এদের নিয়ে?”
এবার রেজাবের মুখটা কেমন যেন ম্লান হয়ে গেল।
মাছ ধরতে গিয়ে ছানা দুটো চোখে পড়েছিল তার। পুষবে বলে ধরে এনেছিল। কিন্তু বাড়িতে নিয়ে যেতেই স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা তাকে বেশ বকাঝকা করেছে।
ছেলেমেয়েরা এখন বড় হয়েছে। এই বয়সে বাবার এমন ‘ছেলেমানুষি’ পাখির নেশা তাদের আর ভালো লাগে না।
তাই বাধ্য হয়ে রেজাব ছানা দুটোকে আবার তাদের মায়ের বাসায় ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছিল।
সেদিন রেজাবকে দেখে আমার মনে হয়েছিল—মানুষ জীবনে অনেক কিছুর কাছে হারে। কেউ সংসারের কাছে, কেউ সময়ের কাছে, কেউ আপনজনের ইচ্ছের কাছে।
রেজাবও হয়তো সেদিন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসার কাছেই একটু পরাজিত হয়েছিল।
রেজাবের পাখিপ্রেমের আরও একটি ঘটনা আমার মনে আছে।
আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল একটা বিশাল তালগাছ। গাছটির একটি খোড়লে বনটিয়া পাখি বাচ্চা তুলেছিল।
খবর পেয়ে রেজাব আর থাকতে পারল না।
পাখির ছানা ধরবে বলে বুক ঘষে ঘষে তালগাছে উঠে গেল।
খোড়লের কাছে পৌঁছে ছানা ধরতে গিয়ে সে ধরে ফেলল তাদের মা পাখিটাকেই।
প্রাণ বাঁচাতে টিয়াটা রেজাবের হাতে সজোরে কামড় বসিয়ে দিল।
রক্ত বেরোতে লাগল।
কিন্তু রেজাব?
পাখিটাকে ছাড়ল না।
রক্তাক্ত হাত নিয়েই পাখি সমেত গাছ থেকে নেমে এল।
তখন মনে হয়েছিল, পাখির প্রতি এই মানুষটার টানটা বোধহয় সত্যিই অন্যরকম।
কষ্ট, রক্ত, বিপদ—কোনোটাই যেন তার কাছে পাখির চেয়ে বড় নয়।
রেজাবকে এত পাখি নিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখে একসময় আমারও পাখি পোষার শখ জেগেছিল।
একদিন সাহস করে তাকে বলেই ফেললাম।
সে যেন এই কথাটারই অপেক্ষায় ছিল।
বলল,
— “দু’দিনের মদ্যি তোর জন্যি পাখির বাচ্ছা নে আসপো।”
দু’দিন পর সত্যিই রেজাব হাজির।
হাতে দুটো বুলবুলি পাখির ছানা।
ছানাগুলো এত ছোট ছিল যে, দেখে মনে হচ্ছিল—সবে যেন ডিমের খোলস ভেঙে পৃথিবীর আলো দেখেছে।
আমি একটা মাটির ভাঁড় জোগাড় করলাম। নিচে নরম খড় বিছিয়ে ছানা দুটোকে সেখানে রাখলাম।
তখন জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ দিক।
আমাদের উঠোনের পাশের জামগাছটা তখন পাকা জামে ভরা। গাছতলা থেকে জাম কুড়িয়ে আনতাম। তারপর শাঁস বের করে সেই ছোট্ট ছানা দুটোকে খাওয়াতাম।
পরদিন সকালেই রেজাব এসে হাজির।
পাখিদের ব্যাপারে তার নজর ছিল ঈর্ষণীয় রকমের তীক্ষ্ণ।
এসেই জিজ্ঞেস করল,
— “কী খাবাচ্ছি ওগা?”
আমি সরল মনে বললাম,
— “জাম।”
রেজাব আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন আমি পাখি পালনের সবচেয়ে বড় অপরাধ করে ফেলেছি।
তারপর গম্ভীর গলায় বলল,
— “এতি কি ওগা প্যাট পোরে?”
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে দৌড়ে বাড়ি গেল।
কিছুক্ষণ পর ফিরে এল সেই পরিচিত কাঁচের বোতল হাতে—যেটার মধ্যে সে ঘাসফড়িং জমিয়ে রাখত।
বোতল খুলে দুটো ধাড়ি ঘাসফড়িং বের করল।
তারপর অতি কষ্টে পাখির ছানা দুটির ছোট্ট ঠোঁট ফাঁক করে একেকটি করে আস্ত ফড়িং তাদের মুখে ঢুকিয়ে দিল।
কাজ শেষ করে তার মুখে যে তৃপ্তির হাসি ফুটল, তা আজও মনে আছে।
বলল,
— “এইবার প্যাট পুরেছে ওগা! আজ আর কিচু খাবাবি নে। বোতলডা রেকে দে। এর মধ্যি আরউ দুডো ফড়িং আছে। কাল সোকালে এবাবে খাবাবি।”
আমি তার কথা মতো ভাঁড়টা তক্তপোশের তলায় রেখে খেলতে চলে গেলাম।
দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো।
তারপর রাত।
ছানা দুটির কোনো আওয়াজ পেলাম না।
ভাবলাম, পেট ভরে খেয়েছে। নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে আছে।
আমিও রাতে খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই পাখিদের কাছে গেলাম।
মাটির ভাঁড়ের ভেতর দুটো ছানা পাশাপাশি পড়ে আছে।
প্রথমে মনে হলো, ঘুমোচ্ছে।
ডাকলাম।
নাড়াচাড়া করলাম।
কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
ভালো করে তাকিয়ে বুঝলাম—
ওরা আর নেই।
গতকাল রেজাবের খাওয়ানো সেই ধাড়ি ঘাসফড়িং দুটোই ছিল তাদের শেষ খাবার।
একটা অদ্ভুত শূন্যতা এসে বুকের মধ্যে বসে গেল।
এত ছোট্ট দুটি প্রাণ। মাত্র দু’দিনের পরিচয়। তবু কখন যে তাদের জন্য মায়া জন্মে গিয়েছিল, বুঝতেই পারিনি।
তাড়াতাড়ি রেজাবকে ডাকতে গেলাম।
সব শুনে সে শুধু বলল,
— “তুই যা, আমি এসতি।”
আমি বাড়ি ফিরে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
এক ঘণ্টা গেল।
দুই ঘণ্টা গেল।
রেজাব এল না।
শেষ পর্যন্ত মাকে সব বললাম।
মা শুনে বকাঝকা করে বললেন,
— “মরা পাখি নিয়ে বসে আছিস কেন? বাগানে ফেলে দিয়ে আয়।”
কিন্তু আমার মন মানল না।
এই দু’দিনেই ওরা আমার কাছে কেমন যেন আপন হয়ে গিয়েছিল।
বাগানের এক কোণে নিড়েন দিয়ে মাটি খুঁড়ে ছোট্ট একটা গর্ত করলাম।
তারপর দুটো মৃত ছানাকে খুব যত্ন করে পাশাপাশি শুইয়ে দিলাম।
মাটি চাপা দেওয়ার সময় বুকের ভেতরটা কেমন ভারি হয়ে উঠেছিল।
তারপর প্রায় দুই সপ্তাহ রেজাবকে আমার সামনে আসতে দেখিনি।
হয়তো সেও বুঝেছিল।
হয়তো বুঝেছিল, তার অতিরিক্ত পাখিপ্রেম আর সেই ভালোবাসা থেকে দেওয়া ভুল উপদেশেই আমার জীবনের প্রথম—এবং শেষ—পাখি পোষার শখটা এমন বিষাদে শেষ হয়ে গেছে।
তারপর সময় অনেক গড়িয়েছে।
আমাদের গ্রামের কত কিছু বদলে গেছে। কত মানুষ হারিয়ে গেছে। কত মুখ স্মৃতির ভেতর ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে গেছে।
কিন্তু রেজাবকে আমি আজও ভুলতে পারিনি।
কারণ রেজাবের মধ্যে একটা অদ্ভুত সরলতা ছিল।
সে পাখি ভালোবাসত—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেই ভালোবাসার সঙ্গে ছিল অজ্ঞতা, আবেগ আর শিশুসুলভ একরোখামি। সে বুঝত না, কখন ভালোবাসা যত্ন হয়ে ওঠে, আর কখন সেই যত্নই অজান্তে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবু তাকে মনে পড়লে আমার হাসি পায়।
আবার মনটাও একটু খারাপ হয়ে যায়।
মনে হয়, রেজাব হয়তো পাখিদের শুধু পুষতে চাইত না—সে তাদের নিজের জগতের মানুষ করে নিতে চাইত।
তার কাছে একটা পাখির ছানা ছিল নিছক একটা পাখি নয়।
ছিল মায়া।
ছিল আনন্দ।
ছিল এক অদ্ভুত টান।
হয়তো সেই টানই তাকে মাঠে টেনে নিয়ে যেত ঘাসফড়িং ধরতে। সেই টানই তাকে রক্তাক্ত হাত নিয়েও তালগাছ থেকে নামিয়ে আনত একটা পাখি নিয়ে। সেই টানই তাকে বারবার পাখির বাসার কাছে নিয়ে যেত।
আর সেই টানই একদিন আমার ছোট্ট পাখি দুটির জীবনের শেষ খাবারটাও বেছে দিয়েছিল।
তাই আজ এত বছর পরেও রেজাবকে মনে করলে একটা প্রশ্নই বারবার মনে আসে—
রেজাবের পাখিপ্রেম কি শুধুই এক ধরনের নেশা ছিল?
নাকি সেটি ছিল একেবারে সহজ-সরল, নিঃস্বার্থ এক ভালোবাসা—যে ভালোবাসা নিজের ভাষায় ভালোবাসতে জানে, কিন্তু সবসময় জানে না কীভাবে ভালোবাসলে প্রিয়জন বেঁচে থাকে?
হয়তো উত্তরটা দুয়ের মাঝখানেই কোথাও।
রেজাব পাখি ভালোবাসত।
ভীষণ ভালোবাসত।
শুধু ভালোবাসার ভাষাটা সে ঠিকমতো জানত না।
